বন্ধ ঘড়ি

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা

কাজী শাকিলা ফেরদৌসী, সিনিয়র অফিসার, ঋণ ও অগ্রিম বিভাগ, আনসার ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক, প্রধান কার্যালয়, ঢাকা।

রোমেনা খাতুন অনেকক্ষন ধরে চেচাচ্ছে, রাহেলা এক গ্লাস পানি দিয়ে যা। রাহেলা পানির গ্লাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

-খালাম্মা চুলায় ভাত বসাইছি, তাই আসতে দেরি হইছে ।

– তুই আজকাল কাজে বেশি অমনোযোগী হয়ে গেছিস, যা গিয়ে কাজ কর।

রাহেলা চলে গেল। রোমেনা খাতুনের বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর আর্দশে উজ্জীবিত ছিলেন। রোমেনা খাতুনের এক হাত আর এক পা প্যারালাইসিস হয়ে গেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পায়ে গুলি লেগেছিল, তারপর থেকে এই অবস্থা। এক বছর ধরে বিছানায় পরা। বাথরুমেও ধরে ধরে নিতে হয়। রোমেনা খাতুনের এটা নিয়ে কোন কষ্ট নাই। সেও বাবার মত বঙ্গবন্ধুর আর্দশে উজ্জীবিত। বঙ্গবন্ধু এক ভাষনে বীরাঙ্গনাদের উদ্দেশ্যে করে বলেছিলেন “তোমরা তোমাদের সন্তানের পিতার নামের জায়গায় লিখে দিবা আমার নাম, আর ঠিকানার জায়গায় লিখে দিবা ধানমন্ডি ৩২”। এত সুন্দর কথা তার মনের সব কষ্ট ভুলিয়ে দেয়। সে মনের মধ্যে বেঁচে থাকার নতুন করে সাহস খুঁজে পায়। যুদ্ধে তো কত মানুষ কত কিছু হারিয়েছে, আমি না হয় একটা পা হারিয়েছি। যদিও যুদ্ধে সে তার বাবাকেও হারিয়েছে কিন্ত সেটার জন্য সে গর্বিত।

রাহেলা  স্থায়ীভাবে বাসায় থাকে, মাসে সাত হাজার টাকা দিতে হয়। ওই বাসার সব কাজ করে। শরীফ সাহেব, রাহেলা খাতুনের স্বামী অনেক ডাক্তার দেখিয়েছে। কিন্তু কোন কাজ হয়নি। একজন থেরাপিস্ট সপ্তাহে তিনদিন এসে ব্যায়াম করিয়ে যায়। হাতে কিছু শক্তি এসেছে, কিন্তু পা একেবারেই অচল। একমাত্র ছেলে জিসান পরে ক্লাস সেভেনে। পুরো সংসারটাই কেমন ছন্নছাড়া হয়ে গেছে। শরীফ সাহেবের রোমেনা খাতুনের  ব্যাপারে  প্রথমদিকে যে কেয়ারিং ছিল, এখন আর সেটা নাই। প্রায়ই দেরি করে বাসায়  ফিরে। কিছু জিজ্ঞেস করলে ঠিকমত উত্তর দেয়না। এভাবেই চলে গেল আরও এক বছর। রোমেনা খাতুন খেয়াল করলো তার স্বামী বাসায় যখন থাকে তখনও মোবাইলে ব্যস্ত থাকে। কার সাথে যেন ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলে। থেরাপিস্ট আসা বন্ধ হয়ে গেলো। রাহেলাকে কিছু ব্যায়াম  শিখিয়ে দেয়া হলো, রাহেলাই এখন সেগুলো করিয়ে দেয়। আত্বীয় স্বজনও খোঁজ খবর নেয়া কমিয়ে দিলো। রোমেনা খাতুনের বাবা, মা ভাই কেউ নেই, আছে শুধু এক ছোট বোন। সেই মাঝে মাঝে এসে বোনকে দেখে যায়। শ্বশুর বাড়ির লোকজনের কাছে কেমন যেন বোঝায় পরিণত হয়েছে সে। তাদের হাবভাব দেখলে মনে হয়, সে তাদের ছেলের জীবনটা নষ্ট করে দিয়েছে। হঠাৎ একদিন কাউকে কিছু না বলে শরীফ সাহেব নতুন বউ নিয়ে বাড়িতে ঢুকলো। রোমেনা খাতুনের ঘরে এসে পরিচয় করিয়ে দিলো। রোমেনা খাতুন তেমন কিছু বললো না, শুধু বললো বিয়ে করার আগে আমাকে জানাতে পারতে, আমি না করতাম না।

রাহেলার ব্যস্ততা আরও বেড়েছে, সোমা মানে শরীফ সাহেবের নতুন বউ এর কাজ করতে করতে, রোমেনা খাতুনের কাছে আসার সময় কম পায়। রোমেনা খাতুনের কোন কিছুই আর গায়ে লাগেনা। এরকম কিছু ঘটবে তা আগেই বুঝতে পেরেছিল সে। নিজেকে নিয়ে আর ভাবেনা, তার সমস্ত চিন্তা ছেলে জিসানকে নিয়ে। সোমার সাথে শরীফ সাহেবের ঝগড়াঝাঁটি প্রায় লেগেই থাকে। আর সেটা লাগে রোমেনা খাতুনকে নিয়ে। শরীফ সাহেব রোমেনা খাতুনকে এসে একদিন বললো

-তোমাকে আমাদের গ্রামের বাড়িতে রেখে আসি, সেখানে হাজেরার মা আছে সে তোমাকে দেখাশুনা করবে। তোমাকে নিয়ে আমাদের মাঝে প্রতিদিন ঝগড়া হয়, এটা না তোমার ভালো লাগছে, না আমাদের। আমরা মাঝে মাঝে গিয়ে তোমাকে দেখে আসবো, বাড়িটাও খালি পরে আছে। হাজেরার বাবা খুব পুরনো ও বিশ্বস্ত কাজের লোক, সে সব বাজার করে দিবে, তার বউ তোমার সব কাজ করে দিবে, হাজেরা রাতে তোমার সাথে থাকবে, জিসান এখানেই থাকবে, ওকে নিয়ে তুমি ভেবো না।

সব শুনে রোমেনা খাতুন বললো

-তোমার যা মনে হয় কর, আমার কোন কিছুতেই আপত্তি নেই।

শরৎ এর কোন এক বিকেলে আজ থেকে অনেক বছর আগে এই গ্রামের বাড়িতে বউ হয়ে এসেছিল। কাকতালীয় ভাবে আজও শরৎ এর কোন এক বিকেল, সাথে আছে ওর স্বামী ও সন্তান, ওরা এখানে তাকে রেখে যেতে আসছে। জিসান খুব কান্নাকাটি করছিল। রোমেনা খাতুন তার চোখের পানি আটকে রেখেছে জিসানের কথা ভেবে। নতুন ভাবে আরও একবার তার বাড়িতে প্রবেশ ঘটলো। যেখানে রাত দিন সবই তার কাছে এক। ঘড়িটা সব সময় বন্ধ হয়েই থাকবে। জিসান বড় হয়ে মায়ের কষ্ট বুঝলে ঘড়িটা যদি কখনও চালু হয় অথবা ঘড়িটা চালু করতে আবারো প্রয়োজন হতে পারে একটা মুক্তিযুদ্ধ। রোমেনা খাতুন সেই  অপেক্ষায় থাকলো ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.